পেডং, কোলাখাম,ঝান্ডির রং মেখে মূর্তিতে স্নান
কোলাখামের হোমস্টে গুলো থেকে ৭ কি মি দূরে এই ফলস। গাড়ি ভাড়া ৯০০ টাকা। কোলাখামে ১৫ টার মতো হোমস্টে আছে। ভাড়া ৪ সজ্জার ঘর ১৮০০ থেকে ২০০০ টাকা। সারাদিন রাত এর খাবার খরচ ৫০০ টাকা জন প্রতি দিন প্রতি। সন্ধ্যা ৬ টার পর কোলাখাম শুনশান, আমি শহুরে আড্ডাবাজ, তাই খুঁজে নিলাম একটা চায়ের দোকান ও কিছু লোকাল মানুষ। চললো আড্ডা আর সাথে চা, বন্ধ দোকানে আড্ডায় ২ বার চা এলো কিন্তু দোকানের মালকিন কিছুতেই চায়ের দাম নিল না। এখানে একটা প্রাইমারী স্কুল আছে, হাসপাতাল, কলেজ সব কালিম্পং এ, জনসংখ্যা ৩০০ হবে আর ৬৪ টা পরিবার আছে, প্রায় সবাই নেপালি সম্প্রদায়, রাই এদের পদবী। - পা র্থ ম য় চ্যা টা র্জী
হ্যালোজেন বাতির নিচে দাঁড়িয়ে পূর্ণিমার চাঁদ দেখা আর পাহাড়ের বুকে দাঁড়িয়ে চাঁদ দেখার মধ্যে অনেক পার্থক্য। ২৫শে অক্টোবর ২০১৮ কোজাগরী পূর্ণিমা ছিল , শহরের থিম পূজোর গ্রাম বাংলা দেখা, আর প্রকৃত গ্রামের পুজো গ্রামে থেকে দেখা যেমন পার্থক্য ঠিক তেমন এটাও । চার তালার ব্যালকনি তে বসে কোজাগরী চাঁদ দেখতে দেখতে আমাদের টীম, মানে GANG এর ছয়জন মেম্বার ঠিক করে ফেললাম যে কাল রাত্রেই আমরা বেড়িয়ে পড়বো বাংলার রূপসী কন্যা উত্তরবঙ্গের কোনো এক অচেনা পাহাড় সাথে নাম নাজানা জঙ্গল এর উদ্দেশ্যে। অনেক লড়াই করে শেষমেশ Njp পৌঁছালাম, বাসে করে ২৬ শে এ সকালে ।
গতকাল রাতেই আমার এক পাহাড়ি সারথী
কে ফোন এ জানিয়েছিলাম NJP তে গাড়ি আনতে । আমায় অনেক অচেনা পাহাড়ি রূপ কে যে চিনিয়েছে, ছেলেটির নাম সাঙ্গী তামাং, ও ঠিক সময় গাড়ি নিয়ে এ উপস্থিত হলো। ওকে বললাম যে ও আমাদের এবার কোথায় নিয়ে যেতে চায় ... সাঙ্গী জানালো আমার আর এক পাহাড়ি ভাই তার হোমস্টে টাকে সে নতুন রূপে সাজিয়েছে, সেখানেই আগে নিয়ে যাবে, তারপর কাল থেকে নতুন পাহাড় নতুন মানুষ দেখাবে। রবি সাই ওই হোমস্টের মালিক, আমার পূর্ব পরিচিত, তাকে ফোনে জানালাম যে আমি আসছি, লাঞ্চ রেডি করে রাখে যেনো। রবি একটি অত্যন্ত ভালো ছেলে , যে আবার সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার, চাকরি না করে পেডং এ এই ১৫ একর জমির উপর গড়ে তুলেছে এক সুন্দর হোমস্টে। এই প্রকৃতির দেওয়া রুপটাতে নিজেকে আষ্টেপিষ্টে জড়িয়েছে । পেডং যেতে NJP স্টেশন থেকে গাড়িতে তিন ঘণ্টা লাগে, ভাড়া চার হাজার কিন্তু রবি ওর হোমস্টে থেকে গাড়ি পাঠালে নেবে বত্রিশ শো টাকা। ৯২ কিমি NJP থেকে পেডং। সেবক রোড হয়ে কালিম্পং পেরিয়ে এই পথ গেছে। দুপুরে পৌঁছলাম, লাঞ্চ করে বেড়িয়ে পরলাম পেডং এর ছোট্ট হাট দেখতে, শুক্রবারের হাট, এত সুন্দর এই পাহাড়ি হাট যে খেয়াল ই করিনি কখন সন্ধ্যা নেমে এসেছিল। দারুন সুন্দর এই হোমস্টে টা। গত পরশু ইট পাথরের শহরের চার তালার ব্যালকনির থেকে দেখা পূর্ণ শশী আর আজকের এই পেডং পাহাড়ের কোলে শুয়ে তৃতীয়ার চাঁদ দেখা একেবারে ভিন্ন একটা স্বাদ। যখন রিসর্ট এ পৌঁছালাম তখন চাঁদের সাদা আলোতে সারা হোমস্টে ঢেকে ছিল। তার শরীর জুড়ে সাদা আলো আর নানা রঙের ফুলের বাহারে সেজে আছে। আমি মুগ্ধ হয়ে এই স্বর্গীয় রূপ দেখছিলাম কখন জানি ভুল বশত একটা সিগারেটে আগুন জ্বালাতে গেছিলাম , হঠাৎ মনে হলো যেন এই মিষ্টি চাঁদের গায়ে দেশলাই এর আগুনের ছেঁকা লাগলো। এই সাদা আলোর মাঝে এই লাল, হলুদ গাঁদা ফুলের রঙটাই যেনো মানানসই, সিগারেটের লাল আগুনটা বেমানান লাগছে এখানে। আমরা সারারাত্রি কটেজের বারান্দাতে বসে এই শান্ত পাহাড়ী গ্রাম্য পরিবেশে নিজেদের উজাড় করে দিলাম গানে আবৃত্তি আর শেষে নিঃশব্দতার শব্দ শুনতে শুনতে কখন জানি কানে এলো দূর থেকে ভেসে আসা ঘুম ভাঙ্গা নাম না জানা পাখিটার প্রভাতী সঙ্গীত। ভোর চারটে তে শুতে গেলাম। তখন ভোরের উত্তাপ ৭ ডিগ্রী ছিল।। সকালে ব্রেকফাস্ট না করে একেবারে লাঞ্চ করে বেরিয়ে পরলাম সেলারিগাঁও। ৯ কি মি পথ রাস্তা আগের মতোই আছে। শুধুই বোল্ডার। মনটা খুব খারাপ হয়ে গেলো। সেলারিগাঁও আগের মত আর সুন্দর নেই। একটু ফাঁকা জমি নেই, শুধুই হোমস্টে । কাজিস হোমস্টে এখন বনলতা নাম নিয়ে কাজী ভাইএর ছেলে জলগো হতে নিজেকে ধ্বংস করে চলেছে। আগের লন টাতে নতুন বাড়ি করেছে। এর সৌন্দর্য্য যেটা সেটাতো আগের বিশাল লন টা সেটাকেই পেশাদারি মনোভাবের কাছে বেঁচে দেওয়া হয়েছে। তক্তে মন চাইলো না। ফিরবার সময় ভাবছিলাম সেলারিগাঁও না এলেই ভালো ছিল। এরপর চলে এলাম আর এক পেশাদারী পাহাড়ি গ্রাম ইচ্ছেগাওঁ তে, চারি দিকে শুধু হোমস্টে , দমবন্ধ এক পরিবেশ। বছর দুএক আগেও এখানে এলে আর মন চাইতোনা একে ছেড়ে যাই কিন্তু এই ঘিঞ্জি ইচ্ছেগাওঁ দেখে ভিতর থেকে একটা কষ্ট ভরা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো।
মন কাড়ল রামধুরা গ্রাম, এত পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন এই ছোট্ট গ্রাম টা যা এককথায় অসামান্য। সেই কারণেই হয়তো কাঞ্চন সারা দিন ধরেই রামধুরার আকাশে ভেসে আছে।এখানে বেশ কটা হোমস্টে আছে যার মধ্যে খালিং হোমস্টে টা আমার ভীষন ভালো লেগেছিল। থাকা খাওয়া সহ দিন প্রতি ও জন প্রতি নয়শ টাকা।
ক্ষণিক আলোকে আঁখির পলকে
তোমায় যবে পাই দেখিতে
হারাই - হারাই সদা হয় ভয়,
হারাইয়া ফেলি চকিতে
জলসা বাংলো থেকে দেখা আজকের সূর্যাস্ত বহুদিন এই মনে ধরে রাখবো। এক স্বর্গীয় রূপে আমি পাগল হয়ে গেলাম , দিনের শেষে এই ঘুমের দেশে সূর্যের চলে যাবার মুহূর্ত টাকে জীবনের আর এক চরম তৃপ্তি এনে দিল।
পেডং থেকে যেমন এই চারটে স্থান ঘুরে দেখা যায় সারাদিনের জন্য ৩০০০ টাকা চুক্তিতে তেমনি ৩৫০০ টাকায় ঘুরে নেওয়া যায় রেশপ, লাভা ও লোলেগাও । এছাড়া রেশম পথ বা সিল্ক রুট এখন থেকে ঘুরে আসা যায় ৪৫০০ টাকাতে।এই সব গুলোই সকালে বেরিয়ে সন্ধ্যায় পেডং ফেরা যায়।।
খোলা চোখে কোলাখাম
পেডং ছেড়ে আজ চলেছি কোলাখাম, কালিম্পঙ জেলার neora জঙ্গলের ধারে এই ছোট্ট পাহাড়ি এবং বাহারি গ্রাম। পেডং থেকে রেশপ হয়ে লাভা বাজার পেরিয়ে এই পথ। অত্যন্ত খারাপ এই পথ।
লাভা থেকে ১০ আর পেডং থেকে ৪০ কি মি মত, সময় লাগে প্রায় দুই ঘণ্টা। কোলাখাম ছাঙে
ফলস যেতে প্রায় দেড় কি মি নিচে নামতে হয়, নামা ও ওঠা দুটোই কষ্টকর, কিন্তু একবার চোখে দেখলে সব কষ্ট ভুলে যাবেন। জঙ্গল পথে পরবে মদন তামাং নামে অতি ভাদ্র ও খুবই পরোপকারী
এক বৃদ্ধ মানুষের একটা ছোট্ট চা এর দোকান। এক ভদ্রমহিলা নামতে খুব কষ্ট পাচ্ছিলেন, ওই বৃদ্ধ মদন তামাং কে দেখলাম ওনার কুকরী নিয়ে এক লাফে পাহাড়ে উঠে একটা গাছের ডাল কেটে এনে ওই ভদ্রহিলাকে দিলেন ও বললেন যে এটাকে ভর দিয়ে নামলে পা পিছলে যাবে না। এই কাজের বিনিময় কোনো পারিশ্রমিক ও নিলেন না। কি অপূর্ব এই ছাঙে ফলস । সাদা দুধের ধারা। আপনি দূর থেকে দেখবেন আর হালকা জালের কণায় কখন ভিজে গেছেন বুঝতেও পারবেন না। মনে মনে গাইতে ইচ্ছে হবে
"তোমার দেহের ভঙ্গিমাটি যেন বাঁকা সাপ
পায়ে পায়ে ছড়িয়ে রাখো যৌবনেরই ছাপ"
কোলাখামের হোমস্টে গুলো থেকে ৭ কি মি দূরে এই ফলস। গাড়ি ভাড়া ৯০০ টাকা। কোলাখামে ১৫ টার মতো হোমস্টে আছে। ভাড়া ৪ সজ্জার ঘর ১৮০০ থেকে ২০০০ টাকা। সারাদিন রাত এর খাবার খরচ ৫০০ টাকা জন প্রতি দিন প্রতি। সন্ধ্যা ৬ টার পর কোলাখাম শুনশান, আমি শহুরে আড্ডাবাজ, তাই খুঁজে নিলাম একটা চায়ের দোকান ও কিছু লোকাল মানুষ। চললো আড্ডা আর সাথে চা, বন্ধ দোকানে আড্ডায় ২ বার চা এলো কিন্তু দোকানের মালকিন কিছুতেই চায়ের দাম নিল না। এখানে একটা প্রাইমারী স্কুল আছে, হাসপাতাল, কলেজ সব কালিম্পং এ, জনসংখ্যা ৩০০ হবে আর ৬৪ টা পরিবার আছে, প্রায় সবাই নেপালি সম্প্রদায়, রাই এদের পদবী।
সক্কাল বেলা উঠে দেখি, একি?
জানালা জুড়ে সাদা শাড়ি পরে দাড়িয়ে আছে এ কে? ছুট্টে গেলাম ব্যালকনিতে , দুচোখ জুড়িয়ে গেলো, আমার বহু দূর থেকে দেখা রাজকন্যা কাঞ্চনজঙ্ঘা , একদম উন্মুক্ত শরীরে দাঁড়িয়ে আছে। এমনকি পাতলা কুয়াশার চাদর টাও শরীরে নেই। কামধেনু দুগ্ধ ধারায় স্নান করে সূর্যের প্রথম তাপে নিজেকে ঊষ্ণ করবার প্রয়াস ।
কোলাখাম এর এই নির্জনতায় কাঞ্চন আজ নিজেকে উন্মুক্ত করেছে যেনো। কোনো এক প্রকৃতি প্রেমিক বাঙালী উপরের ব্যালকনি থেকে গাইছিল
"দ্যাখরে নয়ন মেলে
জগতের বাহার
দিনের আলোয় কাটে অন্ধকার"
আস্তে আস্তে কাঞ্চনজঙ্ঘার কপালে একটা লাল টিপ পড়িয়ে দিলো সূর্য্য দেব, যখন সুর্যের প্রথম আলোর ছটা টা কাঞ্চনঙ্ঘার মাথায় একটা বিন্দুর মত গিয়ে পরলো।
সারা সকাল কাঞ্চনঙ্ঘার সাথে ব্যালকনি তে বসে গপ্পো আড্ডা দিয়ে ব্রেকফাস্ট করে ঝান্ডির পথে পাড়ি দিলাম আর দেখলাম কাঞ্চনজঙ্ঘা আমার চলে যাবার অভিমানে আস্তে আস্তে নিজেকে মেঘের চাদরে ঢেকে নিচ্ছে। আর আমি তখন আমার ৪০ বছর ধরে দূর থেকে দেখে আসা রাজকন্যা কাঞ্চনজঙ্ঘা কে যেনো একদিনের জন্যে পাওয়া ও তার আনন্দের বেদনা নিয়ে লিখে রাখতে ইচ্ছে হচ্ছিল
" তাকে যত তাড়াই দূরে
দূরে
তবু সে আসে মেঘলা চোখে
ঘুরে ফিরে
তাকে আমি হারাই দূরে
দূরে"
njp থেকে কোলাখাম প্রায় ১০৫ কি মি লাভা হয়ে, গাড়ি ভাড়া প্রায় ৪০০০ টাকা ,সময় লাগে ৩.৩০ ঘন্টা. থাকার অনেক গুলো হোমস্টে আছে।
রূপসী ঝান্ডি
আজ চলেছি কালিম্পঙ জেলার আর এক সুন্দরী পাহাড়ি গ্রাম ঝান্ডি তে । গরুবাথান এর মাথার উপর রাজমুকুট এই ঝান্ডি নামের ছোট্ট গ্রামটি।
কোলাখাম থেকে ব্রেকফাস্ট করে ২০ কি মি এই পথে পাড়ি দিলাম। লাভা বাজার থেকে বাহাতি এই পথ চলে গেছে সোজা ডুয়ার্স এর সমতল এ।
পর্যটক এর কাছে এই রাস্তা একটা স্বর্গ যেনো। পথে পরবে জঙ্গল ,ঝর্না,চাবাগান,পাহাড়ি নদী ।
চেলখোলার চেইল নদীর দুরন্তপনা,রকি আইল্যান্ড এর মূর্তি নদীর যৌবনের রূপ, ঝান্ডি চা বাগান যাকে লাস চা বাগান নামেও ডাকা হয়, মানে যার রূপে মাতাল হতে হয়, শান্ত শরীরে শুয়ে থাকা রূপ, দেখতে দেখতে নিজেকে হারিয়ে ফেলা।
ঝান্ডি যাবার পথে পড়বে এই চা বাগান। ব্যস্ততা যতই থাকুক এখানে একবার থামতেই হবে, আমি নাম দিয়েছি মন মোহিনী চা বাগান। চায়ের কাপে তুফান কেন ওঠে এখানে এলেই বোঝা যায়, কারণ চায়ের বাগানে যে ঢেউ খেলচ্ছে, আমি পাহাড়ের ধাপে ধাপে চা বাগান অনেক দেখেছি কিন্তু পাহাড়ের অঙ্গ তরঙ্গের এমন রূপ আগে দেখিনি। আমার মনে পরে গেল স্কুল জীবনে দেখা একটা মুভি চামেলী মেমসাহেবের এর গল্পটা, লেখক নিরোধ চৌধুরী উনি কতটা আবেগ ও অনুভূতি দিয়ে এই গল্পটা লিখে ছিলেন তা এই খানে দাঁড়িয়ে আমি অনুভব করলাম । কেনই চা বাগানের ব্রিটিশ ম্যানেজার রা সাধারণ চা বাগানের শ্রমিক মেয়ের প্রেমে পরে, কেন ?
প্রকৃতির এই রূপে দেহ, মনে একটা প্রেমের ঢেউ বয়ে যায় । এখানে কোন হোমস্টে নেই কেন জানিনা, তবে যদি হতো আমার মনে হয় এর এই যে এত রূপ, সেটার প্রকৃত মূল্যায়ন হতো।
কই বাত নেহি, মনে মনে ঠিক করে ফেললাম আমার এক পাহাড়ি বন্ধু ও ভাই রাজেন প্রধান এর কাছে এই প্রস্তাব টা, এই আবদার টা রাখবো।
যাকে আমি আজও একজন পর্যটন শিল্প ব্যাপারী হিসেবে নয় একজন প্রকৃতি অনুসন্ধানী হিসেবেই মান্য করি। রাজেন ভাইয়াই পারে আমাদের মত সাধারণ মানুষ কে অল্প খরচে নুতন নুতন সব জায়গা তে থাকার আশ্রয় দিতে। আমার কাছে রাজেন প্রধান ডুয়ার্স এর পাখি। মনে স্বাদ রেখে গেলাম , এই চা বাগানে এক রাত্রি কাটানোর, আমি যে দেখতে চাই এর ভোরের কুয়াশা শিক্ত কায়া টাকে, দুপুরের চঞ্চলতা টাকে,সন্ধ্যার ক্লান্ত রূপ টাকে আর রাতের জোৎস্না মাখা অঙ্গ টাকে।
জানিনা ফুলের কি হয় ফাগুন দেখে
জানিনা রাতের কি হয় জোৎস্না মেখে
আমি শুধু পাগল তোমায় দেখে।
তোমাকে স্বপ্নে দেখেও সুখ
তোমাকে সামনে দেখেও সুখ,
এবার স্টিয়ারিং এ বসলাম আর আস্তে আস্তে করে এগিয়ে চললাম ঝান্ডির ইকো হাট এর দিকে। কোলাখাম থেকে ১.৩০ ঘণ্টার পথ ঝান্ডি , রাস্তা ভালো না থাকাতে একটু দীর্ঘ সময় লাগে এই পথ পেরোতে। তবে আমি বলবো এই রাস্তা যদি মসৃণ হত তবে এর সৌন্দর্য্যটাকে তাড়িয়ে তাড়িয়ে উপভোগ করা যেত না।ইষ্টিকটুম এ একটু থামলাম। এই চা বাগানের একটু দূরে এই হোমস্টে,ভারী মিষ্টি এর নাম টাও, এটাও সেই রাজেন প্রধানের। খুব নিরিবিলি এই ইষ্টিকুটুম কিন্তু খুব মিষ্টি একটা আশ্রয়।
এখান থেকে দু কি মি দূরে আমাদের ঝান্ডির ডেরা "ঝান্ডি ইকো হাট" এত্ত সুন্দর এই ইকো হাট , পাহাড়ের ধাপে ধাপে এই সুন্দর রিসর্ট টি ।
পৌঁছেই এক বিরম্বনা, আমরা চেয়েছিলাম এই রিসর্ট এর মধ্যে থাকতে কিন্তু একটা ঘর দেওয়া হলো একটু আলাদা জায়গাতে। আমি পরে এর রূপের কোথায় আসছি আগে এর খারাপ দিক গুলো বলাই ভালো।
এখানে ভালো প্রশাসকের অভাব, প্রতিটা ক্ষেত্রে বিরম্বনা, ঘর বুকিং করবেন এক প্রকার আর যখন যাবেন তখন অন্য ঘর দিয়ে দেবে, খাবার অর্ডার দেবেন এক, পরিবেশিত হবে অন্য। কোনো রুম সার্ভিস পাওয়া যায় না। ভালো দিক গুলো হচ্ছে
এদের ব্যবহার খুবই ভালো, খাবার মান অত্যন্ত ভালো, ঘর গুলো বেশ সাজানো, বিছানায় শুয়ে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা যায়, বাগান টা অপূর্ব। এক কথায় অতি সস্তায় থাকা ও খাওয়া যায়। ঘর ভাড়া ১৭০০ টাকা দুজন তিনজন এর ঘর, খাওয়া খরচ সকাল থেকে রাত্রি ৪৫০ টাকা জন প্রতি । একদিকে পাহাড়, একদিকে উন্মুক্ত কাঞ্চনজঙ্ঘা, একদিকে জঙ্গল আর একদিকে ৬২০০ ফুট নিচে ডুয়ার্স। মূর্তি,জলঢাকা,মহানন্দা , চেল,নেওরা নদী গুলো কে উপর থেকে দেখা যায়। সকাল থেকে একটা হওয়া শুরু হয় তাই এখানে সকালে ও রাত্রে ঠান্ডা একটু বেশি মনে হয়। ঝান্ডির এই ইকো হাটের সৌন্দর্য্য এই বিশাল রিসর্ট এর বাগানে ধাপে ধাপে বসিয়ে দেওয়া এক একটা কাঁচের ঘর, ঠিক যেনো ঝুলনের পাহাড় সাজানো। ছোট্ট চা বাগান এর সাথে, বিভিন্ন রঙের ও ঢঙের গাঁদা ফুল, নানা রঙের কসমস,ডালিয়া,চন্দ্রমল্লিকা, এর সাথে এন্থরিয়াম, অর্কিড,পিটুনিয়া, কেমেলিয়া ফুলের সমারোহ সাথে কমলা লেবু, স্কোয়াশ এর ক্ষেত।
মনে হয় যেনো কাঁচের স্বর্গ। খাবার খুবই ভালো।
ঝান্ডির কাছেই পাবেন ডালিম ফোর্ট , চেইল নদী, ফাফারখেতি, লাভা মনাস্ট্রি। ঝান্ডির সূর্যাস্ত ও সূর্যদয় এর খুব নাম আছে। পাখি আর প্রজাপতি দের প্রেমের ভূমি এই ঝান্ডি। কারণ এখানে আকাশ দিয়েছে নীল , জঙ্গল দিয়েছে সবুজ আর পাহাড় দিয়েছে শুভ্র রঙের ধারা, সেই রঙ মেখে পাখিরা শোনায় দিনভর গান প্রজাপতিরা সেই রং মেখে ডানা মেলে ধেয়ে আসে গায়ে। ঝান্ডি কে ভালো না বেসে থাকা যায় না।
মূর্তি,
কেয়ার অফ ডুয়ার্স
আজ পাহাড় কে ত্যাগ করে সমতলে ফিরে যাওয়া, বিছানা ছেড়ে উঠতে ইচ্ছা করছিল না।
অন্ধকার থেকে অন্ধকার দেখছিলাম জানালার পর্দাটা সরিয়ে। সূর্যের আলো তখনও কাঞ্চন কে স্পর্শ করেনি। আমি অলস দেহটাকে টেনে তুললাম গরম বিছানা থেকে।
"অবসান হল রাতি।
নিবাইয়া ফেলো কালিমামলিন
ঘরের কোণের বাতি।
নিখিলের আলো পূর্ব-আকাশে
জ্বলিল পুণ্যদিনে---
এক পথে যারা চলিবে তাহারা
সকলেরে নিক চিনে।"
এক কাপ চা বানিয়ে সাথে ক্যামেরা আর ৪০ বছরের সঙ্গী সিগারেটের প্যাকেট ও দেশলাই টাকে সাথে নিয়ে ঘরের বাইরে পা ফেললাম। একটা শীতের কামড় খেলাম সারা শরীরে। জ্যাকেট টা চাপিয়ে বারান্দায় চা খেতে খেতে কাঞ্চনের খোঁজ করতে লাগলাম। চা শেষ করে বারান্দার বাইরে এসে দেখলাম গোটা ঝান্ডি গ্রাম তখনও গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে আছে। ঘুমিয়ে আছে সামনের পাহাড়টা, মাথার উপর আকাশটা,
রাত জাগা কুকুর গুলো, জেগে আছি আমি, সাথে আছে কিছু পাখি আর আকাশের তারাগুলো।
লক্ষ্য করলাম রিসর্টের বাইরে,যেখানে গাড়ি গুলো পার্ক করা আছে, সেখানে একটা গাড়ির ছাদে কে একজন বসে আছে। এই রাতদুপুরে গাড়ির ছাদে কেরে বাবা? কিছুটা কৌতুহল আর বাকিটা সময় কাটানোর একটা পাহাড়ি বন্ধু পাবার আশায় নিচের দিকে নামতে লাগলাম। কিন্তু সেকি! মানুষ টা গেলো কোথায়!! কেউতো নেই শুধু একটা উগ্র আঁতরের গন্ধ বাতাসে অবস্থান করছে।অনেক খোঁজাখুঁজি করেও কাউকে পেলাম না। ঘড়ি দেখলাম তখন ৪.১৫ বাজে। একটু ভয় পেয়েছিলাম , ওখান থেকে উপরে উঠতে শরীর টা ভারী হয়ে আসছিল। আবার বারান্দায় বসে নিচে লক্ষ্য করছিলাম কাউকে দেখা যায় কিনা। ভোর হলো, পাখি ডাকলো, সূর্যের স্পর্শ পেয়ে কাঞ্চনও জেগে উঠলো। এবার যাবার পালা সবাই তৈরি হয়ে ব্রেকফাস্ট করে গাড়িতে উঠলাম। আস্তে আস্তে নিচের দিকে এগোচ্ছিলাম আর লক্ষ্য করছিলাম ইকো হাটের সাদা পতাকা টা খুব ধীরে ধীরে দুলছিল, মনে হচ্ছিল খুব কষ্টে টাটা করছে আমাদের।
কখন যেনো চেইল খোলায় পৌঁছে গেলাম। কি সুন্দর এই চেইল নদীর আশপাশটা। ওখানে কফি বিরতি হলো। আবার এগিয়ে চললাম আমাদের শেষ গন্তব্য মূর্তি নদীর কিনারে। রিসর্টের মালিক আমার পূর্ব পরিচিত, যাকে আমি নাম দিয়েছি অচল ব্যবসায়ী। আমি ওনার মধ্যে কখনও পেশাদারী মনোভাব দেখিনি। মূর্তির ধারে এই রিসর্ট টি সামনে সুন্দর বাগান ও মূর্তি নদী মুখী প্রতিটা ঘরের সামনে বারান্দা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ঘরে বসে মূর্তি নদীর ঢেউ গোনা যায়। ভাড়া ১৪০০ টাকা থেকে ২৫০০ টাকা প্রতি দিন।
খাবার ৫০০ টাকা জন ও দিন প্রতি। মাছের সাইজ গুলো বড্ডো বড়। রান্না অসাধারণ।
ভেবেছিলাম এই মূর্তি নদীর ধারে বসে তিনটে দিন কাটিয়ে দেব। কিন্তু মনেতে যাদের চঞ্চলতা আর পা এতে যাদের সর্ষে তাদের আর বিশ্রাম বলে কিছু থাকে না। রাত্রেই ঠিক করলাম কাল একটু তাড়াতাড়ি লাঞ্চ নিয়ে একটু ঝালাং বিন্দু আর পথে পরবে জলঢাকা আর প্যারেন টাকেও একটু দেখে আসব। সকালে বেরিয়ে পরলাম লাঞ্চ করে প্রথমে জলঢাকায় কফি খেয়ে ঝালাং টপকে থামলাম বিন্দুতে কারণ বৃহস্পিবার ওখানে হাট বসে, দেওয়ালির আগে এই হাট খুবই জমজমাট ছিল। লোহার ব্রিজ পেরোলেই ভুটান। আমি আর বেশি এগোলাম না, একটা ছোট্ট গ্রাম এই বিন্দু, একটাই চায়ের দোকান খোলা পেলাম, চা এলো প্রায় ১০ মিনিট পর, চুমুক দিতেই সারা শহর যেনো চনমনিয়ে উঠলো। পিওর দার্জিলিং চা, বড় কাপের দুই কাপ খেলাম আর আমার সারথি খেলো ভেজ মম। দাম মেটানোর সময় তো অবাক হবার পালা, ভারতবর্ষের কোথাও তিন টাকায় বড় কাপের এক কাপ চা পাওয়া যায় কিনা আমার জানা নেই আর সারা পাহাড় ও তরাই জুড়ে মম একটাই দামে পাওয়া যায় তা হচ্ছে ৩০ টাকা, কিন্তু এখানে দিতে হলো ২০ টাকা, কি করে এরা ব্যবসা চালায় জানি এ, সাববু আম্মা , মেয়ে আর মা, দোকানের নাম এই নামেই। এবার প্যারেন এ একটু থামলাম এখান থেকে সানসেট টা দেখতে আমার ভীষন ভালো লাগে, এর আগে আর একটা সুন্দর জায়গা হচ্ছে আপেল স্টোন , একটা লোহার ব্রিজের ধরেই একটা বিশার আকৃতির কালো পাথর পরে আছে , দেখতে অবিকল একটা আপেল এর মতো।
পরের দিন চললাম ছাওয়া ফেলি তে, এই ছাওয়া ফেলির আসল নাম ছাওয়াল ফেলা মানে এখানে আগে এই অঞ্চলের মানুষজন নাকি অবৈধ সন্তান দের ফেলে আসতো বলেই এই নাম টা ছাওয়া ফেলি হয়েছে। এখানে অগুনতি ময়ুর দেখতে পাওয়া যায় সকালে ও বিকালের দিকে। এটা গরুমারা জঙ্গলের ধারে।
যতবার ময়ূর ময়ূরী গুলোকে ক্যামেরা বন্দি করতে চেয়েছি ততবার তেনারা চা গাছের নিচে ঢুকে গেছে। সুন্দর চা বাগান কে পেছনে রেখে
ফিরে চললাম ডেরায়।
অামাদের হাতে আর একটা দিন, পরশু আবার কলকাতায় ফিরে যাবো। অতএব কাল পুরো রেস্ট নেবো ভেবেছিলাম কিন্তু আমাদের সারথী এবং আমাদের রথের যিনি মালিক সে জানালো কাল আর একটা নূতন জায়গায় নিয়ে যাবে। পরদিন যথারীতি বিকি এসে হাজির, আমরাও রেস্টের মাথায় গাঁট্টা দিয়ে বেরিয়ে পড়লাম, মূর্তি থেকে ৩০ কি মি পথ পেরিয়ে পৌঁছালাম এক অদ্ভুত সুন্দর জায়গাতে, নাম "লাল ঝঞ্ঝাট বস্তি" শুনলাম যে লাল ও ঝঞ্ঝাট বাবু নামে দুই জন ব্যক্তি এই অঞ্চলের উন্নয়নের জন্য অনেক লাড়াই করে ছিল, ওনাদের এই অঞ্চলের মানুষ তাদের নেতা হিসাবে মান্য করতো তাই তাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এই নামকরণ। বেশ চওড়া ডায়না নদী , ওপারে ভুটান, এই নদীটাও বিদেশিনী নদী। এ পারে জমি তে সর্ষে ক্ষেত্রে , দারুন রূপসী এই অপরিচিত জায়গাটা। পরে সময় করে তোমার কাছে আবার ফিরে আসবো আবার তোমায় ভালোবাসবো,তোমায় জানবো, তোমায় বুঝবো, তোমায় নিয়ে লিখবো--.......
তুমি সন্ধ্যার মেঘমালা,
তুমি আমার সাধের সাধনা,
মম শূন্যগগনবিহারী ।
আমি আপন মনের মাধুরী
মিশায়ে তোমারে করেছি
রচনা–
তুমি আমারি, তুমি আমারি,
মম অসীমগগনবিহারী ॥
ভেবেছিলাম আজ বিকেল চারটে অবধি শুধু ঘুম আর ঘুম করবো কিন্তু বিকির মত সারথী আর মিত্র দাদার মত মিত্র থাকলে আর বিশ্রাম!
ব্রেকফাস্ট খাইয়ে বললো আজ টোটো পাহাড় ঘুরে এলে হয় না! সবাই নেচে উঠলো , আমার আর ইচ্ছা নেই জানালাম। এমন সময় হঠাৎ ফোন, আমার আর এক পাহাড়ি বন্ধু বিজয় থাপা, যার কুমাই এ একটা তিন ঘরের ১১ জনের হোমস্টে আছে, ভাড়া থাকা খাওয়া ১৩০০ টাকা প্রতি জন প্রতি দিন। আমাকে সপরিবারে লাঞ্চ এর আহ্বান করলো। না বললে শুনবে না, জানালাম ৭ জন আসছি তবে। কে এমন ভাবে ডাকে বলুনতো!
শহরে তো দান প্রতিদান চলে আর এখানে প্রতিদান বলে কোনো শব্ধ নেই, আছে আবেগের টান, ভালোবাসার মান আর অনুভূতির ঘ্রান।
এক ঘণ্টায় পৌঁছে গেলাম, বৃষ্টি শুরু হলো লোয়ার কুমাই থেকেই, আরো সুন্দরী লাগছিল কুমাইকে । বিজয় থাপার বাড়িতে তখন আনন্দের ঝর্না ধরা বইছিল। খুব আড্ডা চললো এর মধ্যে দুই পট চা উড়ে গেলো। দুপুরে ওর নিজের ক্ষেতের সবজি দিয়ে আর ঘরে পারা মুরগির ডিম নিজের জমির চাল, আরহোর ডাল কত কি পদ দিয়ে লাঞ্চ সারলাম। এর পর সবাই মিলে এলাম শনিবারের হাট এ, আমার খুব প্রিয় এই হাট। অনেক্ষন সময় কাটিয়ে এবার রিসর্ট ফিরলাম । তার পর ভারী মনে নিউ মাল জংশন স্টেশন এসে শুনলাম ট্রেন ২ ঘণ্টা পেছনে চলছে। সব ঠিক ভাবে চলেও এখানে এসে যেনো কেমন থেমে গেলাম।
দশ দিনের পেডং, কোলাখাম, ঝান্ডি, ডুয়ার্স শেষ করে আবার ডেরায় ফেরা। একটা তৃপ্তি মেশানো ভালোলাগা জড়িয়ে থাকলো সারা শরীর জুড়ে।




Comments
Post a Comment