দৌড়
আধঘন্টা পেরিয়ে যখন ঘড়ির কাঁটা এক ঘন্টা ছুঁতে চলেছে, সোফায় বসে থাকা পৃথার খেয়াল হয়। প্রথমে দরজায় কান লাগিয়ে জলের শব্দ শোনে। তারপর ইশারা করে দরজা ভেঙে ফেলতে। খুলতেই সবাই হাঁ। কমোডের উপরের ছোট জানলার পাল্লা খুলে দেওয়ালে ঠেসানো। অরিন্দম দাসের চিহ্নমাত্র নেই। ফ্লাশের উপর একটা ছোট্ট টুল প্যাকেট। তার নিচে এক টুকরো কাগজ – ‘সাইকেলে চেন হয়তো আর পড়ে না। চেয়েছিলে। তাই দিয়ে গেলাম।’
হেসে ফ্যালে পৃথা। একটু আঙমোড়া ভেঙে বলে, - চল জয়। কাল থেকে আবার দৌড় শুরু।
মা ন স স র কা র
...চারপাশে জমে ওঠা অন্ধকারে শরীরের ভেতরে জল ফুটছিল যেন। সুমিত নিজে কী করে, বাপের পয়সায় এইসব লপচপানি। পৃথার ব্যাপারে খবরদারিটা কেন, মাথায় ঢুকছিল না। সোজা সামনে এগিয়ে চেপে ধরি সুমিতের জামার কলার, - আমাকে বল ঠিক আছে। মধ্যিখানে কিন্তু ফ্যামিলি আসবে না। আমাকে ঠেলে সরিয়ে দিয়ে চারপাশটা একবার তাকিয়ে হিসহিস করে উঠেছিল সুমিত, - বাপ যেত ইটভাটায় দিশি টানতে আর মা অপরের বাড়িতে রান্না করতে গিয়ে খারাপ রোগ ধরাল। দাদা পেটে বাচ্ছা থাকা মেয়েকে বিয়ে করবে। সে ক্যালানে ফ্যামিলি নাকি মধ্যিখানে আসবে না! কথাও বলিস বটে।
চন্দনপুর ছোট জায়গা। এখানে সবাই কত কিছু কত তাড়াতাড়ি জেনে যায়। আর আমারই শুধু অজানা। থাপ্পড় মেরে ওর মাথাটা ঘুরিয়ে দিতে ইচ্ছে করছিল। হাত তুলেও নামিয়ে নিলাম। সরে এসেছিলাম। মনে হয়েছিল, পৃথা কী বলে জানার দরকার। সুমিত ধোঁয়া ছেড়ে বেরিয়ে গিয়েছিল।
পরের দিনই কলেজের পথে পৃথাকে ধরলাম। ওকে বললাম। সব কথা। খুব নিরুত্তাপ ভঙ্গিতে বলল, - এটা হতেই পারে। সব রিলেশনেই আপস ডাউন থাকে। একটা ভাল চাকরি করো। দেখবে, সব ঠিক হয়ে যাবে।
- তার মানে, এ ব্যাপারটা নিয়ে তুমি সুমিতকে কিছুই বলবে না?
- বলব, কিন্তু বলার এখনও সময় আসেনি।
- সময়-অসময় নয়। ও আমাকে ইনসাল্ট করেছে। তুমি প্রশয় দিচ্ছ।
- আমি কিছুই করছি না। মাথাটা একটু ঠান্ডা রাখো।
- তুমিও কমপ্রোমাইস করছ! আমি চন্দনপুরে আর থাকব না।
- কী বলছ এ সব!
- না, সত্যিই। চোয়াল শক্ত করেছিলাম আমি।
- আর তুমি ভাবছ, আমি তোমার পেছনে দৌড়ব?
- কে বলেছে দৌড়তে....
আবার ড্রয়িং-এ এসে ঢুকল পৃথা।
(১১)
- একটু বেশিই ব্যস্ত থাকো, তুমি, দু’হাতের আঙুল মটকে বললাম আমি।
- বিদ্রুপ করছ, মনে হচ্ছে? সোফায় আবার বসে চোখগুলো একটু ছোট করল পৃথা।
আমার বিয়ার শেষ। টেবিলের উপর নামিয়ে রাখি ক্যান। বলি, - মোটেও না। ব্যস্ততা থাকলে বোঝাই যায়। কিন্তু তুমি তো কিছুই বলছ না।
- বললে তোমার ভাল লাগবে না মোটেও।
- আমার ভাল লাগায় কী যায় আসে আর! হয়তো আর তোমার সাথে দেখাই হবে না কোনওদিন।
- সত্যি দেখা হবে না! পৃথার গলা ভারী লাগল।
- না গো, ব্যবসার জন্য ফাইনালি দিল্লি চলে যাচ্ছি।
- বললে না, কিসের ব্যবসা করছ?
একটু থমকে হাসলাম, - থাক না, তুমি যখন বলছ না, আমিও নাই বা বললাম।
কয়েক সেকেন্ড লম্বা একটা শ্বাস ফেলে মেঝের কার্পেটের দিকে তাকিয়ে রইল পৃথা। উদাসী ভাবটা হাওয়ায় ভাসিয়ে দিয়ে বলল, - এসকর্ট সার্ভিসের কথা কখনও শুনেছ?
গলার স্বর একটু গরম করে বললাম, - তুমি কি মনে করো, আমি এখনও চন্দনপুরে পড়ে আছি? সফিষ্টিকেটেড প্রস্টিটিউশন। সারা ভারতে ছোট বড় শহরে চালু প্রথা এখন। তাতে কী হয়েছে?
- আমি একজন এসকর্ট।
কী প্রতিক্রিয়া দেব, বুঝতে পারছিলাম না। বললাম, - তাহলে যে এত সৎ হওয়ার কথা বলতে, এগুলো তাহলে ফেক? স্পোর্টস, অ্যাথলেটিক্স তাহলে তো কিছুই কাজে এল না। তবে যে বলছিলে দৌড় ঝাঁপ চলছে?
- ফাইভ স্টার হোটেলে বড়লোক, পারভার্টেড ক্লায়েন্ট সামলানো, তাদের কমপ্যানি দেওয়া, এটা কি কম দৌড় ঝাঁপ হল অরিন্দমদা! তবেই না তারা মুঠো মুঠো টাকা দেবে।
সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে পড়লাম। কথাগুলো পৃথার মুখ থেকে শুনতে খারাপই লাগছিল। আমার দিকে তাকিয়ে একটু উদ্ধত দৃষ্টি ছুঁড়ে দিয়ে বলল পৃথা, - কোথায় যাচ্ছ? আর একটু থাকো। আফটার অল আমার সঙ্গে থাকার জন্য তোমাকে টাকা খরচ করতে হবে না।
মাথা কাজ করছিল না। মানিব্যাগটা খুলে পাঁচটা দু’হাজারের নোট সেন্টার টেবিলের উপর ছুঁড়ে ফেললাম, - সব মানুষের অবস্থা সারা জীবন এক যায় না। অনেক শুনেছি একটা সময়। টাকা এখন আমার পকেটেও থাকে। মনে হয়, এটুকু সময়ের জন্য যা দিলাম, তা যথেষ্ট।
এতটুকু রেগে গেল না পৃথা। মুখে মৃদু, একটা বিচিত্র হাসি ফুটিয়ে তুলে, ভ্রু কুঁচকে একটা নোট তুলে নিল নিজের চোখের সামনে। বলল, - থ্যাঙ্কু। যা চেয়েছিলাম, তা পেয়ে গেছি মিঃ অরিন্দম দাস।
স্থির থাকলাম আমি। বললাম, - সন্দেহ করছিলাম। তাহলে ঠিকই করেছি।
দৃঢ় গলায় বলল পৃথা, - একদম। চাইলে তোমাকে পার্ক স্ট্রিটে দুপুরেই অ্যারেস্ট করতে পারতাম। করিনি। কারণ কনফার্ম ছিলাম না, আর জাল নোট আছে কিনা তোমার কাছে। ওখানে একটা ক্যায়োস তৈরি করতেও চাইনি। তবে তোমার কলকাতার ডিলার অতনু সেনকে স্পেশাল ব্রাঞ্চ এতক্ষণে বাস থেকে নামিয়ে নিয়েছে। অনেকক্ষণ মিথ্যে বলেছি। এ ফ্যাটটাও আমার নয়। অপারেশনের জন্য নেওয়া হয়েছিল।
দরজায় এসে দাঁড়িয়েছে জয়। ওর হাতে পিস্তল। আমি আবার সোফায় বসে পড়ি। পৃথা জয়কে বলে, - সিঁড়ির মুখে তিনজন আছে, ডেকে নিয়ে ফ্ল্যাটের দরজা বন্ধ কর।
(১২)
পৃথা বলল, - তাহলে তোমার পেছনে আমি দৌড়েছি বলো? আর তোমাকে রেসে হারিয়েওছি।
ওর মুখে দেখলাম বেশ গর্বের ছাপ। শান্তভাবে বললাম, - আমি কিন্তু তোমার চাকর মানে জয়কে দেখেই সন্দেহ করেছিলাম।
- কী রকম?
- ওর প্যান্টের উপর পুলিশের বেল্ট ছিল। জামার ফাঁক দিয়ে দেখা যাচ্ছিল।
- তখনই পালানোর চেষ্টা করলে না কেন?
- পারতাম না বুঝেছিলাম। সিঁড়ির মুখে তোমার লোক আটকে দিত। এবার তো আরওই পারব না। পুরো ফোর্সকে ফ্ল্যাটে ঢুকিয়ে নিলে। যাগগে, তবে অতনুকে অ্যারেস্ট বোধহয় তোমরা করতে পারবে না।
- আলবত পারব, পৃথা টেবিলের উপর একটা চাপড় দিয়ে গর্জন করে ওঠে, - রেস্টুরেন্টের সি সি টিভিতে ধরা পড়েছে, ও যাবার সময় তোমার ব্যাগটা তুলে নিয়ে যায়।
- আর সে ব্যাগ বাসে আবার এক্সচেঞ্জও হয়ে গেছে। আমি ভ্রু তুলে বললাম।
- তোমার বাড়ি, অফিস তল্লাশি করব আমরা।
- সেখানে কিছুটি পাবে না। আগেই সরানো হয়ে গেছে।
বাঁ হাত তুলল পৃথা। বিরক্ত হয়েছে বেশ। বলল, - আমি একজন স্পেশাল
ব্রাঞ্চ অফিসার অরিন্দমদা। প্রুফ কী করে বের করতে হয় শিখিও না। প্রমাণ টেবিলের উপর পড়ে আছে এখনও। যে নোটের ডিল করেছ, তার সবথেকে বড় সাক্ষী আমি।
- সেটা ঠিক। ওই জন্যে আর কথা বাড়াতে চাইছি না। চাকরি পেয়ে বেশ সাকসেসফুল তুমি দেখছি। যাগগে। এরপর তো থানায় তুলে নিয়ে যাবে হাত কড়া পড়িয়ে। তার আগে একটু ওয়াশরুম যেতে পারি কি?
- থ্যাঙ্কস ফর দ্য কমপ্লিমেন্ট। হ্যাঁ যেতে পারো। আরও ফোর্স এলে আমরা রওনা দেব। জয় সার্চ দ্যাট ম্যান। জয় থাবড়ে থাবড়ে আমার দেহ সার্চ করে। বলে, - নো ওয়েপন ম্যাম।
পৃথা আমার দিকে তাকিয়ে বলে, - যাও। আর জয় সামনে থেকে বাথরুম এঁটে দে।
- ওকে ম্যাম।
আমি বললাম, - এত সন্দেহের কিছু নেই আমাকে। যা টেনশন দিলে পটিতে বসতে হবে। তাই একটু সময় লাগবেই।
পৃথা বলল, - ওকে। ফ্রেশ হয়ে নাও।
উপসংহার
আধঘন্টা পেরিয়ে যখন ঘড়ির কাঁটা এক ঘন্টা ছুঁতে চলেছে, সোফায় বসে থাকা পৃথার খেয়াল হয়। প্রথমে দরজায় কান লাগিয়ে জলের শব্দ শোনে। তারপর ইশারা করে দরজা ভেঙে ফেলতে। খুলতেই সবাই হাঁ। কমোডের উপরের ছোট জানলার পাল্লা খুলে দেওয়ালে ঠেসানো। অরিন্দম দাসের চিহ্নমাত্র নেই। ফ্লাশের উপর একটা ছোট্ট টুল প্যাকেট। তার নিচে এক টুকরো কাগজ – ‘সাইকেলে চেন হয়তো আর পড়ে না। চেয়েছিলে। তাই দিয়ে গেলাম।’
হেসে ফ্যালে পৃথা। একটু আঙমোড়া ভেঙে বলে, - চল জয়। কাল থেকে আবার দৌড় শুরু।
সমাপ্ত

Comments
Post a Comment