মরিচঝাঁপি - পরাজিত হিটলার -
“মরিচঝাঁপি জায়গাটি কোথায় ? বন বিভাগের বাগনা বিট অফিস ও তারই পাশে BOP স্থানটিকে কেন্দ্রবিন্দু ধরলে ঠিক তার বিপরীতে বন বিভাগের সরকারি নারিকেল কুঞ্জ । মাঝখানে প্রায় আধ কিলোমিটার চওড়া একটি নদী । এখান থেকে সুন্দরবনের নদীর খাঁড়ি দিয়ে বাংলাদেশের খুলনা জেলার দূরত্ব কোথাও ১৮/২০ কিমি । ”
ওরা এখানেই চলে এসেছিল বাঁচার শেষ চেষ্টায় । কেন এখানেই ? বলছি । পূর্ব প্রতিশ্রুতি অর্থাৎ বামপন্থীরা যখন পশ্চিমবঙ্গে নিজেদের সরকার প্রতিষ্ঠা করতে লড়াই চালাচ্ছেন তখন তাদের দরকার ছিল বিপুল জনসমর্থনের । ফলে তাঁরা সেসময় এই উদ্বাস্তুদের বহু প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে , পশ্চিমবঙ্গে তাদের পরিচিত জলহাওয়াতেই তাদের সুষ্ঠ পুনর্বাসনের ব্যবস্থা
করবেন যদি তারা ক্ষমতায় আসেন । রামবাবু বলেছিলেন ,
“পশ্চিমবঙ্গের মাটিতেই উদ্বাস্তুদের পুনর্বাসন চাই । ”-অ র্ধে ন্দু ব ন্দ্যো পা ধ্যা য়
কিন্তু ক্ষমতায় আসার পর সেসব হয়ে গেল কথার কথা । স্বার্থ পূরণের পর এদেশের কমিউনিস্ট দল স্বমূর্তিতে ফিরে এলেন । ততদিনে উদ্বাস্তুদের প্রতিক্রিয়া কী, তা বলছি কিন্তু এখানে বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কবিতার কয়েক ছত্র মনে পড়ে ,
“রাজা আসে যায়
রাজা বদলায়
লাল জামা গায়
নীল জামা গায়
... রঙ বদলায়
দিন বদলায় না । ”
দণ্ডকারণ্যের অবস্থা তখন ভয়াবহ রূপ নিয়েছে , আর সেখানে বেঁচে থাকা সম্ভব ছিল না । অথচ CPI(M) (পড়ুন Criminal Party of India (Murderer)) এব্যাপারে আর টুঁ শব্দ করছিলেন না । ফলে উদ্বাস্তু মানুষের ধৈর্য্যের বাঁধ ভেঙে যায় । তারা বামফ্রন্টের প্রতিশ্রুতির ভরসায় এ রাজ্যে পাড়ি দেন । ১৯৭৮ সালে প্রায় ১৫/২০ হাজার উদ্বাস্তু এখানে চলে আসে । কলকাতা শহর তখন চিৎকারে পূর্ণ হতে শুরু করেছে । জ্যোতিবাবুর সিংহাসন নড়ে উঠল ? কেন ? জানা নেই । তবে তিনি নাকি বলেছিলেন যে গোয়েন্দা বিভাগের তথ্য অনুযায়ী তিনি জেনেছিলেন এরা এই সরকারকে উৎখাত করতে নানা চক্রান্ত করে এসেছিলেন । ফলে তিনি যেটা ১৯৭৯ সালে করলেন তা ভয়ঙ্কর । কী করলেন ? বলব । এখানে বলা দরকার যে সেই অমানবিক ঘটনার পরও এখানকার সাধারন মানুষ কোনও প্রতিক্রিয়া দেননি , কেননা CPI(M) সরকার তখন মানুষের কাছে যেন ভগবান । তবে কিছু সুবুদ্ধি সম্পন্ন মানুষ নিশ্চয় প্রতিবাদ করেছিলেন কিন্তু তাদের “মানুষ খ্যাপাবার চাঁই” বলে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল । সাধারন মানুষ ঐদিন চুপ করে না থাকলে দীর্ঘ ৩০ বছর সেই তথ্য চেপে দেওয়া যেত না , আজ যা সামান্য হলেও প্রকাশিত হতে পারছে ঐ সরকার চলে যাবার পর ।
১৯৭৮ সালের উক্ত সময়ে হাজার হাজার উদ্বাস্তু বারাসাত , বসিরহাট , বর্ধমান ইত্যাদি বিভিন্ন জায়গায় চলে আসে । এখন ভীড় ৮০/৫০ হাজার হয় । বর্ধমান এ থাকা লোকজনকে ভাতাড় এলাকায় পাঠানো হলে আমার এক কাকাবাবু ওদের অবস্থা দেখতে যান , কিন্তু CPI(M) এর ক্যাডাররা তাঁকে মাঝরাস্তা থেকেই তাড়িয়ে দেয় । যাই হোক ঐ বিপুল জনগন হাসনাবাদ ও ইছামতীর তীরে এসে ক্রমে জমা হতে থাকে । আইন জারি করে পুলিশের দল তাদের ওপারে যেতে বাধা দিলেও অত মানুষের ভীড়ে পুলিশ চুপচাপ দাঁড়িয়ে দেখে যে নদীর ওপরেই কীভাবে লোকজন নেমে সাঁতরে পার হচ্ছে । ওরা নদী পেরিয়ে সরকার থেকে আটকে দেওয়া লঞ্চ জোর করে ছাড়িয়ে নেয় (যদিও ঐ লঞ্চ মালিকদের পূর্বে ভাড়া অগ্রীম দেওয়া হলেও ঐদিন পুলিশের ভয়ে তারা লঞ্চ নামাননি) । তাঁরা লঞ্চে করে নারকেল কুঞ্জে হাজির হন । এই স্রোতের আগমন জুন মাস অব্দি চলে , জুলাই থেকে আর কাওকে ঢুকতে দেওয়া হয়নি ।
১৯৭৮ সালে আগস্ট নাগাদ ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতি উপস্থিত হয় যা সমস্ত কিছুকে স্তব্ধ করে দিলেও শৈবাল গুপ্ত মহাশয় ও পান্নালাল মহাশয়ের অর্থসাহায্যকে বন্ধ করতে পারেনি । এই সময় কিন্তু কোনও CPI(M) নেতা মরিচঝাঁপি যাননি । তবে RSP নেতারা উদ্বাস্তুদের প্রচুর সাহায্য করেছিলেন । তারজন্য যে তিরস্কার এদের কপালে CPI(M) কর্তৃক জোটে তাতেও এরা সাহায্য বন্ধ করেননি ।
এখানে এসেই দীর্ঘ পরিশ্রমে একটা খুলনা শহর যেন এরা বানিয়ে ফেলতে চেয়েছিলেন । বর্ণনা পাই ,
“ প্রত্যেকে কাজ করছে । একটা চালার মধ্যে দেখলাম ডিঙি নৌকা তৈরী হচ্ছে । বসেছে কামারশালা ও হাঁপর । চেরাই হচ্ছে কাঠের গুঁড়ি । ছক কেটে বসানো হয়েছে বাজার । দেখলাম সোজা সড়ক , দেখলাম স্কুলের চালা , দেখলাম ভেড়ীর জন্য ছেলেরা বানাচ্ছে বাকসো-কল , যেন দশ হাজার রবিনসন ক্রুশো জনহীন বাদার মধ্যে এক অবিকল খুলনা শহর রাতারাতি সৃষ্টি করবেনই , করবেন । ”( দশ হাজার রবিনসন ক্রুশো অবিকল খুলনা বানাচ্ছেন , জ্যোতির্ময় দত্ত , যুগান্তর ৩০ জুলাই ১৯৭৮)
এই তো অবস্থা কিন্তু এইসবে ক্ষতি কী দেখলেন জ্যোতিবাবু তা তিনি নিজেই জানেন । যেন সবকিছুতেই তিনি গদি হারাবার ভয় পেতেন । ফলে বিধানসভায় তিনি এদের নিয়ে যুদ্ধ ঘোষণা করলেন । বললেন যা, তার দীর্ঘ বক্তব্যের তর্জমা করলে যা দাঁড়ায় তা হল ,
মরিচঝাঁপিতে নির্বিচারে গাছ কাটা হচ্ছে
বেআইনি মাছের ভেড়ী তৈরী হচ্ছে
অস্ত্র সংগ্রহ ও সরবরাহ হচ্ছে
বিভিন্ন অসাধু ব্যক্তি নিজেদের অর্থ বিনিয়োগ করছেন রাষ্ট্র বিরোধী ষড়যন্ত্র করে
ইত্যাদি । তৎকালীন SUCI(C) নেতা দেবপ্রসাদ সরকার এর তীব্র বিরোধীতা করে প্রতিক্রিয়া দেন ,
“জ্যোতি বসুর বিবৃতিতে অসত্য তথ্য , স্ববিরোধী বক্তব্য এবং বিভ্রান্তি সৃষ্টির অপপ্রয়াস রয়েছে । বামফ্রন্ট সরকার যে নৃশংস অত্যাচারের পথ বেছে নিয়েছে , ভারতবর্ষের ইতিহাসে তার দ্বিতীয় নজির নেই ।” (মুখ্যমন্ত্রীর বিবৃতি কাঁচা হাতের মকশো, দেবপ্রসাদ সরকার, গণদাবী ৩১ বর্ষ, ১৩ সংখ্যা, ২৮ ফেব্রু . ১৯৭৯ )
এদের যে কোনও উপায়ে তাড়াতে হবে , এই ছিল জ্যোতিবাবুর ভাবনা । তিনি অন্য উপায় না দেখে বনাঞ্চল সংরক্ষণ আইন বলবৎ করলেন । ১৯৭৯ সালে ২৬ শে জানু. খাদ্যদ্রব্য, পানীয়জল, ওষুধপত্র ইত্যাদি আনা নেওয়া বন্ধ করে এলাকা চারদিক থেকে পুলিশ ও ক্যাডার দিয়ে অবরোধ করে দিলেন । শৈবালকুমার গুপ্ত ও পান্নালাল মহাশয় নিজেদের পয়সা খরচ করে হাইকোর্টে এদের দিয়ে কেস করান । ৭ ফেব্রু. আদালত অবরোধ অমানবিক রায় দিয়ে তুলে নেবার হুকুম দেয় । এসময় জ্যোতির্ময় দত্তের একটি লেখা প্রকাশিত হয় যা সুখরঞ্জন সেনগুপ্তের চোখে জল এনে দেয় , এবং তা সত্যিই জল আনার মতই লেখা , তুলে দিলাম ,
“সপ্তাহ দুই পরে ভাতের হাঁড়ি চড়ানো হয়েছে উনুনে । উনুনের চারপাশে মাকে ঘিরে সন্তানরা বসে আছে ভাত খাবে বলে । হাঁড়িতে টগবগ করে ভাত ফুটছে । সেই টগবগ শব্দ শিশুরা উৎকর্ণ হয়ে শুনছে – যেন ঐ টগবগ শব্দ শত্রু দলনে ছুটে যাওয়া শত সহস্র অশ্বখুরের ধ্বনি ।” (যুগান্তর , ১১ ফেব্রু. ১৯৭৯)
অবরোধ তো নাম-কে-ওয়াস্তে উঠল , কিন্তু ততদিনে পুলিশের গুলিতে শেষ হয়ে গেছে বহু প্রান । ২৪ শে জানু. থেকে ৩১ শে জানু. অব্দি ৩৭৫ জন অনাহারে মারা যান কিন্তু গুলিতে যে আরও কত তার ইয়ত্তা নেই ।
এরপর Operation Marichjhapi এর প্ল্যান তৈরি করতে সময় লাগল কয়েক মাস । তারপর কী হল ...
৬মে ১৯৭৯
মরিচঝাঁপিতে পুলিশ ওঠে । স্কুলের দখল নিয়ে ক্যাম্প করে ও তৎকালীন প্রধানশিক্ষক নির্মলকান্তি ঢালি (যাঁর জবানবন্দী “জীবনের জবানী ১ ও ২ ” তে দেওয়া হচ্ছে) কে নানা টোপ দিয়ে এলাকার বাইরে চলে যেতে বলা হয় , কিন্তু তিনি যাননি । তবে সেসময় বেশ কিছু যুবক চলে যেতে বাধ্য হয় ।
৯ই মে ১৯৭৯
জ্যোতিবাবু দিল্লীতে তারকুন্ডের বাড়িতে উপস্থিত হন একটি বিশেষ আশঙ্কায় । সিটিজেন ফর ডেমোক্রাসি এর সভাপতি এই বিচারপতি ভি এস তারকুন্ডে তখন এখানে এসে তদন্ত করতে চান বলে চিঠি করেছিলেন , জ্যোতি বাবু প্রত্যুত্তরে জানান যে “আসার দরকার নেই, আমরা উদ্বাস্তুদের প্রকৃত বন্ধু ।” কিন্তু জ্যোতি বাবু এতে আশ্বস্ত হননি তাই এই আগমন ।
১৩ই মে ১৯৭৯
শুরু হয় অপারেশন ।
“প্রথমে আগুন জ্বালানো হল মরিচঝাঁপি বাজারে , এরপর স্কুল , হাসপাতাল , বেকারি , নৌকা কারখানা । পুড়ে ছাই হয়ে গেল । আগুনে পুড়িয়ে , গুলি করে কত শত নাকি হাজার মৃত অর্ধমৃত উদ্বাস্তুর দেহ নিয়ে লঞ্চে করে ফেলে দেওয়া হল গভীর জঙ্গলে বাঘের খাদ্য হিসেবে । বাকি দেহ ফেলা হল গভীর সমুদ্রে । ”
বলে রাখা দরকার যে এই মনুষ্যদেহ খাবার পরেই সুন্দরবনের বাঘ নরখাদকে পরিণত হয় । এর আগে তা ছিল না । এই প্রসঙ্গে শুধু অনু জালে এর লেখা “Dwelling on Marichjhapi : When tigers became citizens , refugees tiger good” পড়তে অনুরোধ করব ।
এর বেশী বর্ণনা করা কোনও সাংবাদিক , কোনও প্রাবন্ধিক কারও পক্ষেই সম্ভব নয় । কেননা সেসময় ঐ এলাকা পুলিশ ও ক্যাডার দিয়ে এমনভাবে ঘিরে রাখা হয়েছিল যে কাওকে সেখান প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি । রাতারাতি মরিচঝাঁপি খালি করে ১৭ মে ১৯৭৯ তে বিধানসভায় তথ্যমন্ত্রী জানান , “মরিচঝাঁপি উদ্বাস্তু শূন্য করা হয়েছে ।”
জীবনের জবানী ২
“উদ্বাস্তুদের উপর এইরূপ অমানবিক ব্যবহারের প্রতিবাদে , উদ্বাস্তুদের বাঁচার তাগিদে জেগে ওঠে ঐক্যবোধ । স্লোগান হল –
আমরা কারা ?- বাস্তুহারা
বাস্তুহারা ভাই ভাই
পুনর্বাসন বাংলায় চাই ।
আন্দোলন দমন করার জন্য চলল গুলি , মরল উদ্বাস্তু , কত হল কানা খোঁড়া । আন্দোলন আরও তীব্র আকার ধারন করল । ১৯৭৪ সালে ৮ই সেপ্টেম্বর শহিদভাটাতে উদ্বাস্তুদের ওপর অমানবিক বর্বরোচিত গুলিকান্ড হয় । ১৯৭৪ সালে ডিসেম্বরে মানার নিকটবর্তী ভিলাই শহরে জ্যোতি বসুর উপস্থিতিতে বিরাট জনসভা অনুষ্ঠিত হয় । জনসভায় তিনি বলেছিলেন আমরা ক্ষমতায় এলে উদ্বাস্তুদের সুন্দরবনের নায্য দাবি অবশ্যই মেনে নেব । ১৯৭৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে সমিতি সিদ্ধান্ত নেয় আমরা ক্যাম্প ত্যাগ করে পশ্চিমবঙ্গে চলে যাব । প্রথমেই যাবে নওগাঁ ক্যাম্পের উদ্বাস্তুরা (এরাই বাংলাদেশ গঠিত হলে সেখানে আবার ফিরে যায় । কিন্তু বঙ্গবন্ধুর স্বাধীন বাংলায় এদের জায়গা হয়নি । এদের সেসময় আর ভারত আশ্রয় দিতে চায়নি কিন্তু বিপুল ভীড়কে ফেলে দেওয়াও যায়নি ।)। এই উদ্বাস্তুরা খড়গপুরে পৌছনোর সঙ্গে সঙ্গে পুলিশ একজঙ্কেও আর বেরতে দেয়নি । এদেরকে নামিয়ে লাঠিপেটা করে ঐ ট্রেনে ভর্তি করে পাঠিয়ে দেওয়া হয় মধ্যপ্রদেশের তাওয়া প্রজেক্টে । সেখানে ওদের দিয়ে খাল কাটানো হয় ।
পশ্চিমবঙ্গ সরকারের (CPI(M)) জানিয়ে যাওয়া আহ্বানে উদ্বাস্তুরা সকল বাধা বিঘ্ন অতিক্রম করে যথাসর্বস্ব ফেলে রেখে দুর্বার গতিতে ছুটে চলল সুন্দরবনের উদ্দেশ্যে । কত অফিসার হাজার হাজার পুলিশ দিয়ে উদ্বাস্তুদের গতিরোধ করার চেষ্টা হল । কিন্তু শেষ পর্যন্ত সম্ভব হল না । ইছামতি নদীর পাড়ে উদ্বাস্তুদের ঢল নেমেছে । সকলের মুখে স্লোগান , ডেকে এনে বেইমানি করা চলবে না – চলবে না চলবে না । খরস্রোতা ইছামতির ভাটার টানে ঝাঁপিয়ে পড়ল একদল উদ্বাস্তু যুবক । কয়েকজন স্রোতের টানে ভেসে গেল সাগরের দিকে । এরপর শুরু হল সুন্দরবন যাত্রা । কুমিরমারির স্থানীয় মানুষের সহযোগিতায় নদী পার হয়ে পৌঁছন হল মরিচঝাঁপি দ্বীপে ।
অপহৃত শিশু সন্তান দীর্ঘ সময় পরে যদি তার মায়ের কোল ফিরে পায় , তাহলে তার যেমন আনন্দ হয় ঠিক তেমনই আনন্দে উদ্বাস্তুদের দেহমন নেচে উঠল । করানখালি নদীর পাড় দিয়ে আমরা ছোট ছোট ঝুপড়ি করতে শুরু করলাম । প্রথমে সবচাইতে বড় সমস্যা হল পানীয় জল । স্থানীয় লোকের সহযোগিতায় ওদের নৌকায় পারাপার হয়ে কুমিরমারির পার থেকে যার যা হাঁড়ি কলসী ছিল সেই সব পাত্র ভরে জল এনে অতি কষ্টে জীবন বাঁচাতে থাকলাম । যাদের কাছে সামান্য টাকা পয়সা ছিল তারা গিয়ে মোল্লাখালি বাজার থেকে আটা খুদ সস্তা দামের চাল এনে বিক্রি করতে শুরু করেছিল । একটু জায়গা জঙ্গল পরিস্কার করে সেখানে বাজার বসে গেল ।
সমিতির পক্ষ থেকে একটি সাধারন জরুরি সভার আয়োজন করা হল । জানান হল কর্মসূচী ,
বাঁধ নির্মান
খাদ্য ও পানীয় জলের ব্যবস্থা
চিকিৎসার ব্যবস্থা
শিক্ষার ব্যবস্থা
আমাদের এই নতুন পুনর্বাসন কেন্দ্রের সর্বসম্মতিক্রমে নামকরন হল – নেতাজিনগর । উপরি-উক্ত চারটি প্রধান কাজ ছাড়াও ডিঙি নৌকা তৈরী, বাঁধে জল সরবরাহ করার জন্য কাঠের কোল নির্মান , বাজার নির্মান ইত্যাদি কর্মসূচীতে ছিল । গড়ে উঠল নৌকা তৈরির কারখানা , কামারশালা , সুবৃহৎ বাজার । বাজারে গড়ে উঠল রুটির কারখানা , বিড়ির কারখানা , মিষ্টির দোকান , কাপড়ের দোকান , সেলাইয়ের দোকান , নিত্যপ্রয়োজনীয় সকল প্রকার পণ্যের দোকান ।
হঠাৎ তখনই গরিবের বন্ধু সর্বহারা নেতা , উদ্বাস্তুদরদী নেতার আসন টলে উঠল । শুরু হল ছল বল কৌশল একত্রিত করে উদ্বাস্তু উৎখাত অভিযান । আমাদের ওপর মিথ্যে দোষারোপ করতে শুরু করলেন । দরদী নেতা অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করলেন পুলিশ বল । পুলিশদল অনেকগুলি লঞ্চ নিয়ে আমাদের নৌকাগুলি ধাক্কা মেরে ভেঙে গুঁড়িয়ে নদীতে ডুবিয়ে দেয় । প্রায় ৬০-৭০ খানা নৌকা ও আরোহী সবাই গভীর জলে ডুবে মারা যায় ।
কাশীবাবু বিধানসভায় প্রশ্ন তোলেন , কেন উদ্বাস্তুদের ডেকে এনে কোনও সাহায্য সহানুভূতি না দেখিয়ে পাশবিক অত্যাচার করা হচ্ছে ? কৈফিয়ত খুঁজে না পেয়ে দরদী নেতা একরাশ মিথ্যে দোষ(পূর্বে উল্লিখিত) উদ্বাস্তুদের ওপর চাপিয়ে নিজের অমার্জনীয় অপরাধ চাপা দিতে চাইলেন । এবার প্রশ্ন উঠল এসব খবর আপনি কোথায় পেলেন ? জবাবে বললেন , “গোয়েন্দা বিভাগের রিপোর্টে পেয়েছি ।”
হঠাৎ নতুনভাবে সজ্জিত পুলিশবাহিনী শুরু করল উদ্বাস্তু নিধনযজ্ঞ । ২৮.১.৭৯ তারিখ থেকে সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ হয় মরিচঝাঁপি দ্বীপ । খাদ্যের অভাবে মানুষ একপ্রকার লবন ঘাস সিদ্ধ করে খেতে শুরু করেছে । সরকারের বক্তব্য দণ্ডকারণ্যে ফিরে না গেলে এমনি করে আমাদের না খাইয়ে তিলে তিলে শুকিয়ে মারা হবে । ২৯.১.১৯৭৯ তারিখে ওরা আমাদের মাছের ভেড়ী ও খাল কেটে দেয় । ৩১.১.৭৯ তারিখ বুধবার সকাল থেকে পুলিশের অত্যাচার আরও বীভৎস আকার ধারন করে । নেতাজীনগর পাড়ে পুলিশ দু রাউন্ড গুলি চালায় । আর কুমিরমারি পাড়ে ৩০ রাঊন্ড । সঙ্গে আবালবৃদ্ধবনিতা সবার ওপরে নির্বিচারে লাঠিচার্জ হয় । ঐ সময় পাচ বছরের একটি শিশুকে গলায় পা দিয়ে চেপে দমবন্ধ করে পুলিশ মেরে ফেলে । ঐ মৃতদেহগুলি ঘটনার দিনই পুলিশ লঞ্চে করে সন্দেশখালি থানায় নিয়ে যাওয়া হয় এবং ছুরি দিয়ে প্রত্যেকটি লাশের পেট কেটে বেড়মুজুড়িয়া নদীতে ফেলে দেওয়া হয় ।
এরপর এল অভিশপ্ত মে মাস । চিকিৎসা বন্ধ হল , ছেলেমেয়েদের স্কুল পড়াশুনা । তারপর এল ভয়ঙ্কর রাত ১৩ই মে ১৯৭৯ । ঘরে ঘরে মরন চিৎকার শোনা যাচ্ছে । শুধু কান্নার শব্দ আর বাঁচাও বাঁচাও । আশপাশ দিয়ে লোক দৌড়ে গিয়ে নদীতে ঝাঁপ দিচ্ছে শব্দ শুনতে পাচ্ছি । পুলিশ বলছে , শালারা পালিয়ে যাবি কোথায় ? আজ সব শেষ করব । গুন্ডাও নামানো হয়েছে । মেয়েদের বউদের জোর করে তুলে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে । সামন্ত(অমিয় সামন্ত , দ্বায়িত্ব প্রাপ্ত পুলিশ অফিসার) সাহেব বসে আছেন । আমি নগ্ন দেহে দাঁড়ালাম ওর সামনে । বললেন , তোমার পরিবার নিয়ে তুমি চলে যাও । আমি বললাম , অত সুযোগ সুবিধা আমার দরকার নেই । স্বেচ্ছায় আমি নেতাজিনগর ত্যাগ করব না । আদেশ দিলেন একে লঞ্চে ওঠাও । লঞ্চে উঠে দেখলাম নেতাজিনগরের বীভৎস দৃশ্য । সারা নেতাজিনগর জুড়ে তখন দাউদাউ করে জ্বলছে আগুনের লেলিহান শিখা । শুধু মরন চিৎকার শোনা যাচ্ছে বাঁচাও বাঁচাও । কার ছেলে মেয়ে কোথায় কার বাবা মা কোথায় কে কার হিসেব রাখে ।
সকাল না হতেই আমাদের লঞ্চ ছুটে চলল । মরিচঝাঁপি উদ্বাস্তু শূণ্য । আমার স্ত্রীর ভিক্ষে করা পয়সায় একমাস পরে জামিনে আমাকে জেল থেকে বের করে । ফিরে এসে গলা ঢোকাই সেই দণ্ডকের হাঁড়ি কাঠে । ”
দায়ী কারা
ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের পরিকাঠামো সুগঠিত ছিল না । ইংরেজ তাড়ানোর বিপ্লবে যারা জাতি ধর্ম নির্বিশেষে রক্ত দিয়েছিল সেখানে হিন্দুদের ব্যাগে গীতা রেখে আন্দোলন করা কিংবা প্রকৃত অর্থে না হলেও গান্ধীজির আশ্রম কেন্দ্রীক আন্দোলন এদেশের মুসলমান জনসাধারণকে আঘাত করেছিল একথা অনস্বীকার্য । সেজন্যই আলাদা দেশের দাবি ওঠে যা গান্ধিজিও হয়তো বুঝতে পারেননি । তারপর থেকে যা হয়েছে তা বর্ণনা করা হয়েছে । তাতেই প্রবন্ধ অনেক দীর্ঘ হয়েছে । ফলে কলেবরের কথা মাথায় রেখে অনেক কথা লেখা সম্ভব হল না । তাই কিছু ত্রুটি থাকবেই । সে দায় প্রাবন্ধিকের ।
কিন্তু ২০১৪ সালেও কেন বাংলাদেশির দল এদেশে চলে আসছে ? তাহলে কি স্বাধীন বাংলাদেশের জন্মও সঠিক হয়নি । ক্ষমতাবান মানুষ যেমন দুর্বলকে শোষণ করে তেমনই ভারতও বাংলাদেশকে শোষণ করছে । বাংলাদেশে বর্তমানে দুর্নীতি যে জায়গায় পৌছেছে তা অকল্পনীয়। এতে বাংলাদেশের সরকার তথা তাদের সাম্প্রদায়িক মনোভাব বিশালভাবে দায়ী । মানুষের সামান্যতম পরিষেবা দিতে তারা অক্ষম । অন্যদিকে ফারাক্কা বাঁধ ও তিস্তা বাঁধ প্রভৃতি দিয়ে পদ্মার জলতল কমিয়ে দিয়েছে ভারত । এর কুফল হিসেবে খাদ্যাভাব ও অর্থনৈতিক নিম্নাগমন হচ্ছে যা বাধ্য করছে হিন্দু মুসলিম নির্বিশেষে মানুষদের এখানে চলে আসতে । এই কি স্বাধীনতা হওয়া উচিত ?
শাহবাগ আন্দোলনে মানুষের জমে থাকা ক্ষোভের প্রকাশ দেখা গেলেও তাকে আন্দোলন বা বিপ্লব বলা যায় না । মানুষের মনে রাখা দরকার “without a revolutionary party revolution fails .” তাই যদি সংখ্যা গরিষ্ঠ মানুষ সচেতন হয়ে সঠিক বিপ্লবের পথে নামেন তবেই তা ফলপ্রসু হবে নয়তো বাঙালি জাতি যার কোনও এদেশ নেই ওদেশ নেই তারা অচিরেই বিলুপ্ত হবে । ভবিষ্যতে পূর্বভারত যদি একত্রিত হয়ে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের পথে যায় তবেই কি এই শোষণ থেকে মানুষ মুক্তি পাবে । সে আলোচনা আপাতত মুলতুবি থাক । প্রসঙ্গান্তরে গিয়ে বলব যে, এই লেখাটির মূল অনুপ্রেরণা মরিচঝাঁপির উদ্বাস্তু মানুষ, মধুময়বাবু ও কঙ্কর জ্যেঠু, সুতরাং, তাঁদের প্রতি আমার আন্তরিক কৃতজ্ঞতা ।
যাই হোক, এখন সাধারন মানুষ বিচার করে দেখুন , জীবনের দায় কাদের ? আমি এখানে এখানে কয়েক ছত্র কবিতা দিয়ে পাঠকের দরবারে আত্মসমর্পন করব ,
“চোখের সামনে ধুঁকলে মানুষ
উড়িয়ে দেবে টিয়া
তুমি বললে বিপ্লব , আর
আমি প্রতিক্রিয়া । ” (শঙ্খ ঘোষ)
ঋণস্বীকার ও গ্রন্থপঞ্জী ঃ
Communalism and Minority Crisis – কঙ্কর সিংহ
আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর – আবুল মন্সুর আহমেদ
Minority Politics in Bangladesh – গোলাম কবীর
Reporting India – তায়া জিনকিন
মরিচঝাঁপি ছিন্ন দেশ ছিন্ন ইতিহাস – মধুময় পাল (সম্পাদিত)
মরিচঝাঁপি নিজের কথায় – মধুময় পাল (সম্পাদিত)
ইত্যাদি



Comments
Post a Comment