Skip to main content

স্মৃতিকথা


শাপমোচন 

 মর্নিং কলেজ সেরে গুটি গুটি পায়ে বন্ধুরা আর আমি রওনা দিলাম কফি হাউসের দিকে। পথে পড়লো কল্পতরু। নাম শোনা, কিন্তু খেয়াল করিনি আগে কোনো দিন। পান খাওয়ার নেশা নেই, কিন্তু ওই যে বাঙালিয়ানা কোথায় যাবে। "সুখের প্রাণ গড়ের মাঠ"।-প্রিয়ব্রত ঠাকুর



"কল্পতরু" নামটা  মানেই সবার কাছে কলকাতার বিখ্যাত পানের দোকান, আর আমার ছাত্র জীবনের এক দুঃসাহসিকতায় ভরা স্মরণীয় দিন।
   
    কথায় আছে,  পুঁটিরাম এর কচুরি, প্যারামাউন্ট এর সরবত, কফি হাউস এর ইনফিউসান, (অবশ্যই ১টা কে ২টো) সাথে সিগারেটের কাউন্টারে ধোঁয়া ওঠা আড্ডা, সাহিত্য, শিল্পের উন্মেষ, সঙ্গীত চর্চা। সর্বোপরি কল্পতরুর পান এবং ছাত্র রাজনীতির মতান্তর, তর্কের ঝড়। এই সব ছাড়া বাঙালি ছাত্রজীবন একেবারেই বৃথা। আমার ছাত্র জীবন কিন্তু বৃথা হয়নি। সব গুলোই একটু একটু একটু করে স্পর্শ করেছি ওই সময়। তাই বহুগুণে সম্বলিত হতে হতেই, 'বেগুন' হয়ে গিয়েছি। কিন্তু ছাত্র হিসেবে যতই খারাপ হই না কেন, আঁতলেমি করতে ছাড়িনি একফোঁটা। 

পুঁটিরামের কচুরির কথা শুনলে, এখনো জিভে জল টানি, বলতে গিয়েই টেনে নিলাম আর একবার। প্যারামাউন্ট এর সরবত, আর নতুন কী বলবো। কালিকার ফিশ ফ্রাই, আর  তার ধোঁয়া ওঠা চপ এর মনের উপর চাপ, কী ছেড়ে কী বলি!

'দৈনিক সন্মার্গ' এর প্রথম পাতায় সুরেন্দ্রনাথ কলেজের ছাত্র রাজনীতির বিখ্যাত মারপিটের ছবিরও ব্র্যান্ড এম্বাসাডার , কে হল ? না এই অধম।..

কফি হাউসের টেবিলে ঝড় তুলতেও কখনো সুযোগ ছাড়িনি, এই স্বল্পজ্ঞান নিয়েও। এদিক ওদিক থেকে খবর সংগ্রহ করে বড় বক্তিয়ার আমি (কোন কারণে খবরের কাগজ পড়া বন্ধ থাকলে আমার গলা ব্যথা থাকতো শ্রোতা হিসেবে সেদিন যোগদান ছিল,-নিজেকে বাঁচানোর সহজ উপায় ।)

সবই ভালো চলছিল ..এই কল্পতরুই কল্পনা থেকে বাস্তবে "হাতে হ্যারিকেন ধরাবে আর ..."।  সেদিন ভাবিনি। আর সেটা যে কি কষ্টদায়ক বিগত ২১ বছরে টের পাচ্ছিলাম। যেন এক অতৃপ্ত আত্মা ঘুরছিল এত দিন ধরে আমার মধ্যে ।

     আজ মিষ্টি পানটা মুখে দিয়ে কোথায় যেন ২১ বছরের আগের অতৃপ্ত আত্মা শান্তি পেল। আসলে হাঁড়িকাঠে গলা দেওয়া বলে না; বা  কুড়ুল নিজের পায়ে মারা, অথবা কালিদাস হওয়া কিম্বা ক্ষুদিরাম ( উনাদের দুজনকে পরম শ্রদ্ধা করেই) এই সব বাছা বাছা চলতি প্রবচনগুলো যদি একই সাথে কার্যকর হয় একজনের উপর, তার কী অবস্থা হতে পারে একটু কল্পনা করলেই বোঝা সম্ভব । আমার ক্ষেত্রে সবগুলো একই সাথে একই সময় কার্যকরি হয়েছিল বা নিজেই নিজেকে অলংকৃত করে ছিলাম।

   আজ তৃপ্তি করে পানের খিলি মুখে দিয়ে অর্থধারক বা বটুয়া খুলে বললাম কত দাদা ?
......২১ টাকা ( ১ টা মিষ্টি পান )।

      কী অদ্ভুত ফের, ২১ বছর আগে সেদিন পকেটে ছিল ২১ টাকাই । সম্বল সারা মাসে কলেজ খরচা বাবদ বাড়ি থেকে পাওয়া মাসিক ২০০ টাকা ভাতা আর ছাত্র পড়ানোর সুবাদে প্রাপ্ত ১৫০ টাকা, সর্বমোট ৩৫০ টাকা। তখন সুরেন্দ্রনাথ আইন কলেজের ২য় বর্ষের  ছাত্র। নিত্য যাতায়াত, ১ টাকার ৪ টে কচুরি আর অন্যান্য খরচা চালিয়ে কোনো মতে স্বাচ্ছন্দ্যে মাস অতিবাহিত হয়েই যেত দৈনিক কমবেশী ১১ টাকা খরচাতেই। বাকি বন্ধুদেরও একই অবস্থা। তবে আজ মোটামুটি সবাই আমরা কমবেশী সুপ্রতিষ্টিত।

     উল্টোরথের পরপরই সেদিন সবাই ঠিক করলাম যে জগার জন্মদিন, ভুল না করলে যা উল্টোরথ এর দিনই। আর শঙ্খর, তার কিছু দিন আগে। সব মিলিয়ে একই সাথে সেদিন পালন হবে কফি হাউসে কফি ও ভেজ কাটলেট সহযোগে ।
   
 মর্নিং কলেজ সেরে গুটি গুটি পায়ে বন্ধুরা আর আমি রওনা দিলাম কফি হাউসের দিকে। পথে পড়লো কল্পতরু। নাম শোনা, কিন্তু খেয়াল করিনি আগে কোনো দিন। পান খাওয়ার নেশা নেই, কিন্তু ওই যে বাঙালিয়ানা কোথায় যাবে। "সুখের প্রাণ গড়ের মাঠ"।

       রসনা তৃপ্ত করতেই তো গেলাম আমি। এখনো তাই হঠাৎ করে ভর দুপুরে বাবুয়া আর বুকাই এর সাথে কোলাঘাটে ছুটি, পাইস হোটেলে ইলিশ মাছ খাবার লোভে। বন্ধুদেরকে ভুল বুঝিয়ে শক্তিগড়ে ল্যাংচা,  মিহিদানা আর সীতাভোগের টানে হাজির পৃথুদার বা বাবুয়ার সাথে। বা জনাই এর মনহরণকারী , মনোহরার প্রেমে আত্মা তৃপ্তি করতে অসুবিধা হয় না আমার, রজতকে সাথে নিয়ে। যত কষ্ট হয় আমার সপ্তাহ শেষে বাজার করতে । তাই বোধ হয় যথার্থই আমাকে ছোট বেলায় "অভির" বদলে "লোভী" বলে সম্বোধন করা হত।

     যাই হোক, অন্যরা সামনে সামনে চলেছে পিছনে  আর শেষে আমি। কল্পতরুতে পান খেতে হল্ট নিল আমাদের  'পানাতুর ' বান্ধবী।  ( অভিধানে পানাতুর মানে পান' আসক্ত  হিসেবে ব্যবহার করা যায় কিনা জানি না…) । সেই প্রথম কল্পতরু দর্শন। সব বড় বড় মনীষীদের ছবি টাঙানো ওখানে। সবাই খেয়ে গেছেন। 

"আমিও তো একদিন বিখ্যাত হবই, আমি কেন খাবো না ?"
এই অহং বোধের সাথে জিভটাও লকলকিয়ে উঠলো। আর ব্যস, আমিও এক মুহূর্ত অপেক্ষা করে ঘোষণা করলাম, জন্মদিন পালনের পর, সবাইকে পান খাওয়াবে এই শর্মা। যেমন ভাবা তেমন কাজ। ৫টি সুগন্ধি যুক্ত মিষ্টি পান বানানোর হুকুম দিয়ে দিলাম, যেন "জমিদারের লাতি"।  আমার ঠাকুমা ছোট্ট বেলায় বলতেন আমি কিছু আবদার করলেই ।

    আমার পাড়ায়, সেই সময় মিষ্টি পান ১ টাকায় ১ টি। সেই হিসেবে ভালো বিখ্যাত দোকান, ২ টাকা মূল্য পানের অনুধাবন করে একটি কড়কড়ে ১০ টাকার নোট, ২১ টি টাকা যা সর্বশেষ সঞ্চয় থেকে বের করে তো আমি অপেক্ষামান। ভাই এটা দেবো ? ওটা দেবো ? যাই বলেন দোকানি আমি বলি হ্যাঁ, তার ফলাফল যে এত জোরে ধাক্কা দেবে ভাবতে পারিনি আমি। 

     পান গুলো হাতে নিয়ে নিজেকে নবাব মনে হল , বন্ধুদের বলবো তুম ভি ক্যা ইয়াদ রাখোগে / রাখোগি!!

 কত দাদা ?
২৭.৫০ । ঠিক শুনলাম তো ? 
কত ?  ২৭.৫০ । একই উত্তর এলো। 

    আমার এক দিদি খুব অসহায় অবস্থাতে পড়লে বলতো ধরণী খণ্ডিত হও, আমি প্রবেশ করি। আমার ও তখন সেই অবস্হা। সবাই মিটি মিটি হাসছে , মনে হচ্ছে আমি সব ভুলে গিয়েছি, আমি কে ? তোরা কে ? পানের অর্ডার তো আমি দিই নি, কোন দিক দিয়ে পালাতে সুবিধা হবে ? কলেজ স্কোয়ার দিয়ে না সোজা কফি হাউস এর সামনে দিয়ে দৌড়ে আড়িয়াদহে গিয়ে থামবো।

       পৃথিবীর সব থেকে অসহায় মানুষ আমি, মনে হচ্ছে জয় বাবা ফেলুনাথ এর জটায়ু আমি । পান গুলো যেন ছুরি, বন্ধু গুলোর হাসি যেন ঘুলঘুলি দিয়ে বন্দুক তাক করে আছে আমার দিকে, আর দোকানি নির্ঘাত মগণলাল মেঘরাজ। ঢোক গিলে ১ মিনিট বলা ছাড়া উপায় নেই, পকেট হাতড়ে পেন এর বদলে ২১ টাকা।

   বন্ধুদের দয়া দক্ষিণে ২১ টাকার সাথে ৬.৫০ জোড়া দিয়ে বিধ্বস্ত আমি কোনো মতে কফি হাউসে চেয়ারে গিয়ে বসলাম। সব কীরকম গুলিয়ে আছে, পৃথিবীর সব সুখ শেষ। আমার ভাগের ভেজ কাটলেট টাও শঙ্খ বেটা সাঁটিয়ে দিলো ।  ভোজন শেষে সবাই যখন পান খেয়ে পরম তৃপ্তিতে আমার দিকে তাকাচ্ছে , নিজেকে একটা আস্ত তন্দুর করা সাজানো মুরগি ছাড়া কিছু ভাবতে পারছিলাম না। আমি টেবিলে প্লেটে সাজিয়ে রাখা, আর সবাই খুব তৃপ্তি ভোরে আমাকেই যেন চিবোচ্ছে। 

    হ্যাঁ, তবে আমার বন্ধুরা খুব ভালো সেদিন চাঁদা তুলে ২.৫০ পয়সা টিপস না দিয়ে, দিয়েছিল আমাকে বাড়ি ফেরার বাস ভাড়া ।

      আজ আবার ২১ বছর পরে মনে করিয়ে দিল সেই দিনের কথা । আর খুব হাসলাম । এখনো হাসছি নিজেই।
কিছু ঘটনা চিরদিন মনে থাকে, তাই আজ পানটা মুখে দিয়ে আমার এত বছরের শাপমোচন হলো, আর সত্যি রসনা তৃপ্তি। সেদিন উপভোগ করতে পারিনি, তবে আজ করলাম । 

বলতে দ্বিধা নেই কল্পতরুর পান না খেলে সত্যি বাঙালিয়ানা সম্পূর্ণ নয়, বিখ্যাত হইনি ঠিকই, কিন্তু আজ সত্যি বিখ্যাত কল্পতরুর সাথে আমি নাম জড়িয়ে ফেললাম । বলতে পারব আমিও কিন্তু কল্পতরুর পান, মন প্রাণ ভরে খেয়েছি।

Comments

Popular posts from this blog

এবং অধ্যায় ১০ম সংখ্যা

এবং অধ্যায়     সাপ্তাহিক পত্রিকা (১০ম সংখ্যা)           Tiitel Sponsor : CityClub , Chinsurah Bus Stand,Chinsurah,Hooghly, 712101         Co-Sponsor : KITCHEN SERIES [Kuthchina & Dr. Aquagaurd]         Bislaxmitala,Pipulpati,Chinsurah,Hooghly, 712101         Powered By : F ive Star Tour & Travels ,Chinsurah Bus stand,         Chinsurah,Hooghly, 712101          Supported By : OverallCad ,Pragatinagar,Bhagabatidanga,         Chinsurah,Hooghly,712101         দেবরাজ জানা (প্রধান সম্পাদক)        ধীমান ব্রহ্মচারী (সম্পাদক)      মৌসুমী ব্রহ্মচারী (সহ সম্পাদক)       রায়ের বেড়, চুঁচুড়া, হুগলি,৭১২১০১       সম্পাদক টিম       প্রশান্ত ভট্টাচার্য,দেবজ্যোতি কর্মকার,   ...